"সবাই রেডি, গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষা!" বাংলায় তৃণমূলের ডামাডোলের মাঝেই সৌমিত্রর বোমা



কলকাতা: বাংলায় জমানা বদলের পর এবার কি তৃণমূল শিবিরে সবথেকে বড় ধস নামতে চলেছে? বুধবার বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁর একটি বিস্ফোরক দাবি ঘিরে রাজনীতির অলিন্দে তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছে। সৌমিত্রবাবুর দাবি, তৃণমূলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক এবং ২০ জন সাংসদ বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সবুজ সংকেত দিলেই তাঁরা একযোগে পদ্ম শিবিরে যোগ দিতে পা বাড়িয়ে রেখেছেন। বিজেপি সাংসদের সাফ কথা, "দিল্লি একবার ‘হ্যাঁ’ বললে, তৃণমূলের অস্তিত্বই মুছে যাবে।"


রাজনৈতিক মহলের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে লোকসভায় অন্তত ২০ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। সৌমিত্র খাঁর মুখে ঠিক ‘২০’ সংখ্যাটি উঠে আসায় এই দাবিকে স্রেফ হালকাভাবে ওড়াতে পারছে না ওয়াকিবহাল মহল। তবে প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় এই দাবিকে ‘বাস্তবহীন ও সস্তা অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।


বুলডোজার হুঁশিয়ারি ও কাকলি-রুমর

তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ করে সৌমিত্র খাঁ এদিন বলেন, "উনি একজন পাপী, আর পাপীদের ঠাঁই জেলেই হয়। আজ ওঁর বাড়ির সামনে বুলডোজার দাঁড়িয়ে আছে। ২০২১ সালে বিজেপি কর্মীদের ঘরবাড়ি ভাঙার পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবার করতেই হবে।"


এদিকে, লোকসভায় তৃণমূলের চিফ হুইপের পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পরেই বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের একটি পদক্ষেপ ঘাসফুলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা একটি বৈঠকে বেশ কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন কাকলি। এর পরপরই কেন্দ্রের তরফে তাঁকে ‘ওয়াই’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া নিশ্চিত করতেই দলবদলের জল্পনা এখন তুঙ্গে। অন্যদিকে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে কাউন্সিলরদের ইস্তফা না দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও ইস্তফার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে খবর।


পুরবোর্ডে সুনামি, শুভেন্দুর তদন্তের খাঁড়া

রাজ্যের নতুন শুভেন্দু অধিকারী সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিগত জমানায় পৌরসভাগুলিতে হওয়া সমস্ত আর্থিক দুর্নীতির ফাইল খোলা হবে। গত সপ্তাহে তোলাবাজির অভিযোগে ৩ জন তৃণমূল কাউন্সিলর গ্রেফতার হতেই রাজ্যজুড়ে পুরবোর্ডগুলিতে ইস্তফার ঢল নেমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ইতিমধ্যেই পুরসভাগুলিতে সরকারি প্রশাসক বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।


সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চলে-


ভাটপাড়া পুরসভা: ৩৫ জন কাউন্সিলরের মধ্যে চেয়ারম্যান-সহ ৩০ জনই ইস্তফা দিয়েছেন।


হালিশহর পুরসভা: ২৩ জনের মধ্যে ১৬ জন কাউন্সিলর একযোগে পদত্যাগ করেছেন।


কাঁচরাপাড়া পুরসভা: এখানেও ১৪ জন কাউন্সিলর দল ছেড়েছেন।


ভাটপাড়ার বিদায়ী ভাইস-চেয়ারম্যান দেবজ্যোতি ঘোষের ক্ষোভ, "পুরকর্মীদের বেতন দেওয়ার টাকা নেই, দলও কোনও দিশা দেখাতে পারছে না।"


তদন্তের জের ও রহস্যমৃত্যু

তৃণমূলের এই চরম দুর্দিনের মাঝেই গত ২৩ মে দক্ষিণ দমদমের দাপুটে কাউন্সিলর সঞ্জয় দাসের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়, যা দলের অন্দরে আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। সঞ্জয়বাবু পুরনিয়োগ দুর্নীতিতে ইডির হাতে গ্রেফতার হওয়া প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই মামলার তদন্তের আঁচ এখন এসে পড়েছে তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী অদিতি মুন্সির ওপর। একদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তাড়া, অন্যদিকে পৌরসভাগুলিতে গণ-বিদ্রোহ, এই সাঁড়াশি চাপের মুখেই সৌমিত্র খাঁর ‘২০ সাংসদ ও ৫০ বিধায়ক’ ভাঙানোর ফর্মুলা তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার কাজ করবে কি না, সেটাই এখন দেখার।