রেড রোড অতীত, বকরি ইদের সকালে নতুন ইতিহাস ব্রিগেডে! কড়া নিয়মে খাঁ খাঁ করছে গরুর হাট

কলকাতায় রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে বকরি ইদের নমাজের প্রতীকী ছবি


কলকাতা: তিলোত্তমার উৎসবের ইতিহাসে এই প্রথম এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন রদবদল। দীর্ঘ কয়েক দশকের চেনা ঐতিহ্যে ছেদ টেনে ২০২৬ সালের বকরি ইদের প্রধান জামাত এবার সরল কলকাতার রেড রোড থেকে। পরিবর্তে ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বকরি ইদের নমাজ পাঠ করলেন ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে। ১৯৭৮ সালের পর এই প্রথম রেড রোডের বিকল্প হিসেবে সেজে উঠল ব্রিগেড। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠনের পর শহরের চেনা ইদ উদযাপনে এই বড় বদল এল।

ভোলবদল রাজনীতির চেনা আঙিনার

কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত রেড রোড চত্বরেই বছরের দুটি ইদের নমাজ পড়ার দীর্ঘ রেওয়াজ ছিল। বিগত তৃণমূল জমানায় এই ধর্মীয় সমাবেশ একটি বড় রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছিল। মাথায় কাপড় দিয়ে প্রতি বছর ইদের সকালে রেড রোডের মঞ্চে খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি ছিল বাংলার রাজনীতির অত্যন্ত চর্চিত বিষয়। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রাক্তন বাম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কখনও ইদের নমাজের মঞ্চে দেখা যায়নি।

তবে গত বছরই সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রেড রোডে ইদ জামাত নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনা দফতরের কাছে থাকায় এবার আর সেখানে নমাজের অনুমতি মেলেনি। নতুন সরকারের জমানায় কলকাতার রাস্তায় বা জুম্মাবারে জটলা করে নমাজ পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে, পুণ্যার্থীদের মূলত মসজিদেই নমাজ পাঠ করতে হচ্ছে। সেই আবহেই এবার বিকল্প হিসেবে সামনে আসে ব্রিগেড, যেখানে কিছুদিন আগে ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।


কড়া নিয়ম গরুর হাটে, নাখুদা মসজিদের বড় বার্তা


বকরি ইদের আগে এবার উত্তর কলকাতার বিভিন্ন পশুর হাটগুলি ছিল কার্যত ফাঁকা। অনেক ব্যবসায়ী বুধবার গরু নিয়ে হাটে হাজির হলেও দিনভর বসে থেকে খদ্দের পাননি। এর পেছনে রয়েছে রাজ্য সরকারের কড়া আইনি খাঁড়া। গত ১৩ মে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, উপযুক্ত ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও পশু জবাই করা যাবে না। তাও আবার প্রকাশ্য স্থানে নয়, শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত কসাইখানাতেই এই প্রক্রিয়া চালানো যাবে। বেআইনি পশু জবাই রুখতে বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সরকারি বাহিনীকে।

বকরি ইদে গরু কুরবানি যে কোনও আবশ্যিক ধর্মীয় প্রথা নয়, তা আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সরকারের এই নতুন নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাখুদা মসজিদও। মসজিদ -এর তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাজ্যের সরকার যখন প্রকাশ্য স্থানে প্রাণী জবাই নিষিদ্ধ করেছে, তখন বকরি ইদের দিনেও তা করা উচিত নয়। কারণ পাশে অন্য ধর্মের মানুষ থাকেন, তাঁদের অস্বস্তি হতে পারে। ফলে এবার অধিকাংশ এলাকাতেই গরুজবাই হয়নি।

রাস্তায় নমাজ বা প্রকাশ্য কুরবানির কড়াকড়ি থাকলেও বকরি ইদের চেনা আনন্দ ও সম্প্রীতির আবহে কোনও খামতি ছিল না。 সকাল থেকেই মসজিদে মসজিদে চলেছে বিশেষ দোয়া। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে কোলাকুলি করে ইদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে বিরিয়ানি, কোরমা, কাবাব, রেজালার মতো মাংসের সুস্বাদু পদ আর মিষ্টিমুখ করতে সেমাই-পায়েস। আত্মীয়-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ আর ছোট-বড় সকলকে উপহার দেওয়ার চেনা রীতিতেই পালিত হলো বকরি ইদ।