বর্ডারে কাঁটাতার ঘিরে উত্তেজনা, বিজিবিকে কড়া হুঁশিয়ারি মিঠুনের

কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে তিন বিঘা করিডর সংলগ্ন সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ ও বিজিবি আপত্তি ঘিরে উত্তেজনার প্রতীকী ছবি
ফাইল চিত্র : তিন বিঘা করিডর সংলগ্ন সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ ঘিরে বিজিবি-র আপত্তির অভিযোগে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।


কলকাতা: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তৎপরতা বাড়ছে বলে প্রশাসনিক মহলে দাবি। সেই আবহেই কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে তিন বিঘা করিডর সংলগ্ন এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, কলসিগ্রাম এলাকায় অনুপ্রবেশ রুখতে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হতেই বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবি আপত্তি তোলে। এই ঘটনাকে ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে চাপানউতোর তৈরি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই কোচবিহারে একটি ক্যানসার হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিজেপি নেতা তথা অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ নিয়ে বিজিবি-র আপত্তির প্রসঙ্গে তিনি কড়া সুরে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষার কাজে বাধা দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা সময়ই বলবে।

তিন বিঘা করিডর কেন গুরুত্বপূর্ণ?

তিন বিঘা করিডর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থান, স্থানীয় জনবসতি, সীমান্ত পারাপার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক নজরে রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হল অনিয়ন্ত্রিত পারাপার, চোরাচালান এবং সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ রোখা। তবে সীমান্তের কিছু অংশে জমির অবস্থান, স্থানীয় বসতি এবং দুই দেশের সীমান্ত সংক্রান্ত নিয়মের কারণে কাজ এগোনো অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে।

কাঁটাতারের কাজ ঘিরে কী অভিযোগ?

সূত্রের খবর অনুযায়ী, মেখলিগঞ্জের কলসিগ্রাম এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হওয়ার পর বিজিবি আপত্তি জানায়। তাদের আপত্তির কারণ কী, তা নিয়ে এখনও সরকারি স্তরে বিস্তারিত স্পষ্ট নয়। সীমান্তে যে কোনও স্থায়ী নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকে। সেই নিয়ম, দূরত্ব এবং সীমান্তরেখা সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখেই কাজ এগোনো হয়।

ভারতীয় পক্ষের দাবি, অনুপ্রবেশ রুখতে এবং সীমান্ত সুরক্ষা বাড়াতে এই কাজ জরুরি। অন্যদিকে বিজিবি যদি কোনও আপত্তি জানিয়ে থাকে, তা সাধারণত সীমান্তরেখা, নির্মাণের অবস্থান বা প্রোটোকল সংক্রান্ত প্রশ্নেই হয়ে থাকে বলে সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন।

মিঠুন চক্রবর্তীর মন্তব্য

কোচবিহারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, বিজিবি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এমন পরিস্থিতিতে কী হয়, তা দেখার বিষয়। যদিও তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।

মিঠুনের এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যু উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলায় অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং সীমান্ত সুরক্ষা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়।

নতুন প্রশাসনের কড়া অবস্থানের দাবি

মিঠুন চক্রবর্তীর বক্তব্যে নতুন প্রশাসনের সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দৃঢ় মনোভাবের কারণেই সীমান্তে কাঁটাতারের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।

তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী প্রশাসন বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি দিতে অনীহা দেখিয়েছিল। সেই কারণে সীমান্ত সুরক্ষার একাধিক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল বলে তাঁর দাবি। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে পূর্ববর্তী সরকারের বক্তব্য বা সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

বিএসএফ-এর ভূমিকা

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত বিএসএফ-এর ওপর। সীমান্তে কাঁটাতার, নজরদারি টাওয়ার, রাস্তা, আলো এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রুখতে কাজ করে বিএসএফ।

তবে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের জন্য জমি, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা, কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন। কোনও অংশে কাজ শুরু হলে স্থানীয় পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকলকে গুরুত্ব দিতে হয়।

বিজিবি-র আপত্তি কেন সংবেদনশীল?

বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের আপত্তির বিষয়টি সংবেদনশীল, কারণ এটি দুই দেশের সীমান্ত সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত ফ্ল্যাগ মিটিং, সমন্বয় বৈঠক এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়।

সীমান্তে কোনও ভুল বোঝাবুঝি বড় উত্তেজনায় পরিণত না হয়, সেই কারণে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই কূটনৈতিক সংযমও প্রয়োজন।

উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন ইস্যু

তিন বিঘা করিডর এবং সীমান্ত সুরক্ষা উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। অনুপ্রবেশ, জমি, চোরাচালান এবং সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা—এই সব প্রশ্নে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, কাঁটাতার নির্মাণ ঘিরে বিজিবি-র আপত্তির অভিযোগ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে মিঠুন চক্রবর্তীর মন্তব্য আগামী দিনে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিজেপি এই ইস্যুকে সীমান্ত সুরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের কথা বলবে।

সীমান্তবাসীর বাস্তব সমস্যা

সীমান্তের রাজনীতি যতই তীব্র হোক, সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাও কম নয়। অনেক গ্রামে চাষের জমি, বাড়িঘর এবং বাজার সীমান্তের খুব কাছাকাছি। কাঁটাতার নির্মাণ বা নিরাপত্তা কড়াকড়ির ফলে তাঁদের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিকাজ এবং জীবিকায় প্রভাব পড়তে পারে।

সেই কারণে সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সুবিধা ও মানবিক দিকও বিবেচনা করা জরুরি। প্রশাসনের উচিত স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ এগোনো।

সামনে কী হতে পারে?

এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত বিএসএফ ও বিজিবি-র মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিং হতে পারে। সেখানে নির্মাণকাজ, সীমান্তরেখা, প্রোটোকল এবং আপত্তির কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। যদি বিষয়টি স্থানীয় স্তরে মেটে না, তবে উচ্চতর প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা হতে পারে।

ভারতীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি কাঁটাতারের কাজ বৈধ ও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছে বলে জানানো হয়, তাহলে কাজ এগোনোর সম্ভাবনা থাকবে। তবে আপত্তি থাকলে তা মেটাতে দুই দেশের বাহিনীর সমন্বয় জরুরি।