নয়াদিল্লি: সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বারুদের গন্ধ এবার সরাসরি ভারতীয় উপভোক্তাদের পকেটে আঘাত করল। বিশ্ব বাজারের অস্থিরতার জেরে দেশজুড়ে রান্নার খরচ থেকে শুরু করে যাতায়াত, সবকিছুতেই বড়সড় ধাক্কা দিয়ে লিটার পিছু পেট্রলের দাম ২ টাকা ৬১ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা বাড়িয়ে দিল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি দর ১০০ ডলারের গণ্ডি অনেক আগে টপকে গেলেও দেশের বাজারে এতদিন ক্ষতের ওপর প্রলেপ দিয়ে দাম বাড়তে দেওয়া হয়নি। ফলে তিল তিল করে জমতে থাকা বিপুল লোকসানের খাঁড়া সামাল দিতেই গত ১৫ দিনে এই নিয়ে চার-চারবার দাম সংশোধন করতে বাধ্য হলেন তেল কর্তারা। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধং দেহি মনোভাব এবং বৈশ্বিক তেলের প্রধান ট্রাফিক রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়াই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ।
চার মহানগরে তেলের নতুন দরপত্র:
নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের প্রধান মেট্রো শহরগুলির পেট্রল পাম্পে যে নতুন প্রাইস ট্যাগ ঝুলছে, তা নিম্নরূপ—
কলকাতা: এখানে নতুন করে ছ্যাঁকা লেগেছে তেলের দামে। পেট্রল লিটার পিছু ২.৮৭ টাকা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ টাকা ৫১ পয়সায়। অন্যদিকে ডিজেল ২.৮০ টাকা বেড়ে ছুঁয়ে ফেলেছে ৯৯ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ কলকাতায় ডিজেল এখন স্রেফ সেঞ্চুরি করার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।
দিল্লি: রাজধানীর বুকে প্রতি লিটার পেট্রল মিলছে ১০২ টাকা ১২ পয়সায় এবং ডিজেল বিকোচ্ছে ৯৫ টাকা ২০ পয়সায়।
মুম্বই: বাণিজ্যনগরীতে পেট্রল ও ডিজেলের নতুন রেট যথাক্রমে ১১১ টাকা ২১ পয়সা এবং ৯৭ টাকা ৮৩ পয়সা।
চেন্নাই: দক্ষিণের এই মেট্রো সিটিতে পেট্রল ১০৭ টাকা ৭৭ পয়সা এবং ডিজেল ৯৯ টাকা ৫৫ পয়সা।
দৈনিক হাজার কোটির ধকল বনাম ৭৬ দিনের স্বস্তি
সমগ্র আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর আলো ফেলে ওএনজিসি (ONGC)-র ডিরেক্টর (এক্সপ্লোরেশন) সুষমা রাওয়াত সংবাদসংস্থা ANI-কে জানিয়েছেন, "আমেরিকা-ইরান সংঘাতের পারদ যখনই একটু নামছে বা কোনও শান্তি চুক্তির বার্তা আসছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের গ্রাফ নামছে। আবার অনিশ্চয়তা বাড়লেই দর চড়চড় করে উঠছে।" তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, বিশ্ব বাজারের এই চরম ওঠানামার মধ্যেও ভারত সরকার টানা ৭৬ দিন পর্যন্ত দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে উপভোক্তাদের সুরক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু এর জেরে তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলিকে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছিল। তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, "একটি বাণিজ্যিক সংস্থাকে লোকসানের এই পাহাড় মাথায় নিয়ে কতদিন চালানো সম্ভব?" উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৩ মে-ও এক দফায় মহার্ঘ হয়েছিল জ্বালানি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কি এবার আগুন?
২০২২ সালের এপ্রিল থেকে দীর্ঘ সময় ভারতের তেলের বাজারে এক প্রকার স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। কেবল ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ঠিক আগে আমজনতার ক্ষোভ প্রশমন করতে লিটার প্রতি ২ টাকা দাম কমানো হয়েছিল। তবে চলতি মে মাসের ১৬ তারিখে এক ধাক্কায় ৩ টাকা দাম বাড়ার পর থেকেই মহার্ঘতার এই নতুন চ্যাপ্টার শুরু হয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, জ্বালানির দাম এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকলে লজিস্টিকস ও পণ্য পরিবহণ খরচ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে খুব দ্রুত শাকসবজি, চাল-ডাল থেকে শুরু করে প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
