কল্যাণী: বাংলার রাজনৈতিক মহলে এবার এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন মোড়! একদিকে তৃণমূলের অন্দরে পদ খোয়ানোর ক্ষোভ, অন্যদিকে নতুন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক, এই দুইয়ের রসায়নে মঙ্গলবার কল্যাণীর মাটিতে তৈরি হলো এক চরম নাটকীয় মুহূর্ত। এদিন নদীয়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনা, এই তিন জেলার প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশে সশরীরে হাজির হলেন বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার! শুধু কাকলিই নন, শুভেন্দুর ডাকা এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে যোগ দিয়েছেন দেগঙ্গা ও স্বরূপনগরের দুই তৃণমূল বিধায়কও। রাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ছবিকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বঙ্গ রাজনীতিতে।
চিফ হুইপ পদ যেতেই ক্ষোভ, এবার শুভেন্দুর ডেরায়
প্রশাসনিক বৈঠক বলা হলেও, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই উপস্থিতি অত্যন্ত অর্থবহ। দিনকয়েক আগেই বারাসত জেলা সভাপতির পদ থেকে সরানো হয়েছিল তাঁকে। এর পর তৃণমূলের লোকসভার মুখ্য সচেতক বা ‘চিফ হুইপ’-এর পদ খোয়াতেই সামাজিক মাধ্যমে কার্যত বোমা ফাটান বারাসতের বর্ষীয়ান সাংসদ। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব যখন চরমে এবং রাজনৈতিক মহলে তাঁর দলবদলের চর্চা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে তাঁর এই হাজিরা সেই জল্পনার আগুনে ঘি ঢালল।
‘দলীয় নয়, প্রশাসনিক বৈঠক’, সাফাই কাকলির
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দেওয়া নিয়ে গুঞ্জন শুরু হতেই অবশ্য ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বৈঠক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এটা কোনও দলীয় কর্মসূচি নয়। এটি সম্পূর্ণ সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মসূচি। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই আমি একজন সাংসদ হিসেবে এখানে উপস্থিত হয়েছি।" কাকলি বিষয়টিকে প্রশাসনিক তকমা দিয়ে আড়াল করতে চাইলেও, রাজনৈতিক মহলের মতে, এই উপস্থিতির মাধ্যমে আদতে তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভটাকেই প্রকাশ্যে এনে দিলেন তিনি।
মমতার বয়কট নীতি ভেঙে শুভেন্দুর মাস্টারস্ট্রোক
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় বিরোধী দলের সাংসদ বা বিধায়কদের সরকারি বৈঠকে ব্রাত্য করে রাখার যে অলিখিত রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী হয়েই তার উল্টো পথে হাঁটেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, দলমত নির্বিশেষে এলাকার সমস্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেই নীতি মেনেই এদিন উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূল সাংসদ ও বিধায়কদের চিঠি পাঠানো হয়। আর সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েই সোজা কল্যাণীর বৈঠকে পৌঁছে যান কাকলি ও দুই তৃণমূল বিধায়ক।
রাজ্যের পালাবদলের পর শুভেন্দুর এই ‘সমন্বয় রাজনীতি’ একদিকে যেমন বিরোধীদের এক টেবিলে বসিয়ে বড় চাল দিল, তেমনই তৃণমূলের অন্দরে চিড় ধরা ক্ষোভকে আরও উস্কে দিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
