কলকাতা: রাজ্যে জমানা বদলের পর থেকেই বৃত্তটা ক্রমশ ছোট হচ্ছিল ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নিরাপত্তা ছাঁটাই থেকে পুরসভার জোড়া নোটিস,
একের পর এক প্রশাসনিক ধাক্কার মাঝেই এবার সরাসরি তাঁর কালীঘাটের বাসভবন ‘শান্তিনিকেতন’-এর অন্দরে থাবা বসাল পুলিশ। সোমবার দুপুরে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা এবং কলকাতা পুলিশের উর্দিধারী আধিকারিকদের একটি দল আচমকাই হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ওই হাই-প্রোফাইল ডেরায় প্রবেশ করে। শুধু ঢোকাই নয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্দরমহল থেকে একটি কম্পিউটার মনিটর বাজেয়াপ্ত করে ‘কলকাতা পুলিশ’ লেখা একটি সাদা গাড়িতে তুলে নিয়ে চম্পট দেন আধিকারিকরা। ভরদুপুরে এই আকস্মিক অভিযানের কারণ নিয়ে লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি রহস্য আরও বাড়িয়ে বলেন, "এ বিষয়ে এখনই কিছু জানানো যাবে না।"
পুলিশের গাড়িটি বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিষেকের গ্যারেজ থেকে একটি বিলাসবহুল গাড়ি বের হতে দেখা যায়। নথি বলছে, গাড়ি এবং ‘শান্তিনিকেতন’ বাড়িটি, দুই-ই বিতর্কিত ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থার নামে পুরসভার খাতায় নথিভুক্ত। এদিকে, এই বাড়িটির কর মূল্যায়ন নিয়েও বড়সড় গরমিলের অভিযোগ তুলেছে কলকাতা পুরসভা। কর্পোরেট সংস্থার নামে নথিভুক্ত প্রাঙ্গণে কীভাবে সপরিবারে অভিষেক থাকছেন এবং ‘মালিক-অধিকৃত’ হিসেবে কর দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে চুক্তিপত্র ও লেনদেনের নথি চেয়ে নোটিস পাঠিয়েছে পুরসভার অ্যাসিসর-কালেক্টর দফতর। এর পাশাপাশি, কলকাতা পুর আইনের ৪০০(১) ধারায় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে লতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসকে জোড়া নোটিসও দেওয়া হয়েছে। যার জবাবে গত শনিবারই পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের কাছে ১০ দিনের সময় চেয়েছে ওই সংস্থা। গত শুক্রবার এই বেআইনি নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন করতেই প্রকাশ্যেই মেজাজ হারিয়ে অভিষেক বলেছিলেন, "বাড়ির কোন অংশ অবৈধ, নির্দিষ্ট করে বলা হোক, তারপর উত্তর দেব।"
ভোটের ফল ঘোষণার ঠিক দু’দিন পর থেকেই নতুন রাজ্য সরকারের কোপে পড়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোগ করা তাঁর ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তা বলয়, অতিরিক্ত বাহিনী এবং বিশেষ পাইলট কারের সুবিধা রাতারাতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবন এবং ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে গার্ডরেল ও পুলিশি ক্যাম্প। এমনকি বিমানবন্দরের ধাঁচে অভিষেকের বাড়ির ভেতরে বসানো অত্যাধুনিক সিকিউরিটি স্ক্যানারটিও টেনে হিঁচড়ে বার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। নবান্ন সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাইডলাইন মেনে একজন সাধারণ সাংসদ ঠিক যতটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য, এখন ততটুকুই বরাদ্দ রয়েছে তাঁর জন্য।
নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং পুরসভার জোড়া নোটিসের পর সোমবার দুপুরে যেভাবে পুলিশ খোদ অভিষেকের অন্দরমহলে ঢুকে কম্পিউটার মনিটর তুলে নিয়ে গেল, তাতে স্পষ্ট, জমানা বদলের বাংলায় তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের ওপর আইনি ও প্রশাসনিক চাপ এবার বহুগুণ বাড়িয়ে দিল নতুন সরকার।
