সন্ন্যাসী হতে চেয়ে বিয়েই করেননি! রামকৃষ্ণ মিশনের সেই ‘বিবাগী’ ছেলেই আজ বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী
২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর শুভেন্দু অধিকারী। পরপর দু’বার, নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো হাই-ভোল্টেজ কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি এখন রাজ্য রাজনীতির অবিসংবাদিত ‘জায়ান্ট কিলার’। কিন্তু শান্তিকুঞ্জের মেজো ছেলের এই মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রাস্তাটা একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বিবাগী হতে চাওয়া এক যুবক থেকে কীভাবে তিনি বাংলার প্রশাসনিক প্রধান হয়ে উঠলেন, সেই গল্প হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও।
আধ্যাত্মিক ভাবনা ও সংসার ত্যাগের সিদ্ধান্ত:
শুনলে অবাক লাগতে পারে, ছোটবেলা থেকেই প্রবল আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী ছিলেন শুভেন্দু। প্রতি শনিবার নিয়ম করে রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন এবং নিজের জমানো খুচরো টাকা মিশনে দান করতেন। তাঁর হাবভাব দেখে পরিবারের লোক একসময় ভেবেছিলেন যে তিনি হয়তো সংসার ত্যাগ করে বিবাগী হয়ে যাবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সন্ন্যাসী হননি ঠিকই, কিন্তু রাজনীতি আর মানুষের কাজ করবেন বলে বিয়ে করে সংসারীও হননি।
ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও প্রথম লড়াই:
আটের দশকের শেষদিকে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র পরিষদ’-এর হাত ধরে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৯৫ সালে কংগ্রেসের টিকিটে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করার কিছুদিন পর শুভেন্দু সেই দলে যোগ দেন। তবে শুরুতেই সাফল্য আসেনি। ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া এবং ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তমলুকে বাম প্রার্থীর কাছে তাঁকে হারের মুখ দেখতে হয়।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন ও উত্থান:
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে ২০০৬-০৭ সালে। ২০০৬ সালে প্রথমবার দক্ষিণ কাঁথি থেকে বিধায়ক হন তিনি। এরপর ২০০৭ সালে সিপিএমের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের জমি রক্ষা আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন অধিকারী পরিবারের এই মেজো ছেলে। তাঁর নেতৃত্বেই ২০০৮ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল। ২০০৯ সালে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে প্রথমবার সাংসদ হন শুভেন্দু। ২০১৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রবেশ ঘটে।
দূরত্ব বৃদ্ধি ও গেরুয়া শিবিরে যোগদান:
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু ছন্দপতন ঘটে যখন তাঁকে সরিয়ে যুব তৃণমূলের সভাপতি করা হয় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সমান্তরাল সংগঠন ‘যুবা’ তৈরি হয়। এরপর ২০১৯-২০ সালে একাধিক জেলার পর্যবেক্ষকের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে দলের সঙ্গে তাঁর ফাটল চূড়ান্ত আকার নেয়। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রীর সিংহাসনে ‘দাদা’:
২০২১-এর নির্বাচনে নন্দীগ্রামে খোদ তৃণমূল নেত্রীকে হারিয়ে বিরোধী দলনেতা হিসেবে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। আর ২০২৬-এ ভবানীপুরের মাটিতে ফের একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা সম্ভব।
হিন্দু ভোটের একত্রীকরণ থেকে শুরু করে দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল বাড়ানো— শুভেন্দুর এই অদম্য জেদ আর রাজনৈতিক কৌশলের কাছেই আজ বাজিমাত করেছে গেরুয়া শিবির। আর তাই, পঁচিশে বৈশাখের সকালে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন সেই ‘বিবাগী’ হতে চাওয়া যুবকই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন