নয়াদিল্লি: বিধানসভা ভোটের পর থেকেই বিধ্বস্ত তৃণমূল কংগ্রেস৷ সোমবার, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন খোদ দেশের রাজধানীতে উপস্থিত, ঠিক তখনই লোকসভায় দুই টুকরো হয়ে গেল তৃণমূলের সংসদীয় দল। রাজনীতির এমন এক অভূতপূর্ব ও কঠিন সঙ্কটের দিনে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ইন্ডি (INDIA) জোটের সাংবাদিক বৈঠকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেজাজে দেখা গেল তৃণমূল সুপ্রিমোকে। তাঁর চিরপরিচিত চেনা আগ্রাসী রূপ উধাও; পুরো সাড়ে সাত মিনিটের সাংবাদিক বৈঠকে কার্যত বিধ্বস্ত ও নির্বাক হয়ে বসে রইলেন তিনি। এমনকি সাংবাদিকদের কোনও প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে সবার আগে মঞ্চ ত্যাগ করেন তিনি। পুরো সময়জুড়ে তাঁর মুখে শোনা গেল মাত্র দুটি শব্দ, তাও আবার জোটের সিদ্ধান্ত আউড়ে যাওয়া কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে দুটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে।
খাড়্গেকে শুধরে দিলেন খোদ তৃণমূল নেত্রী
এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের ঠিক ডানদিকের আসনে বসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত দুটি শব্দ উচ্চারণ করেন— ‘অ্যাট্রোসিটি’ ও ‘ভার্চুয়ালি’। খাড়্গে যখন ইন্ডি জোটের নেওয়া ৫টি মূল সিদ্ধান্তের কথা এক এক করে জানাচ্ছিলেন, তখন ৩ নম্বর পয়েন্টে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট, কর্মসংস্থান ও কৃষক ইস্যু নিয়ে কেন্দ্রের কাছে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার দাবি তোলেন। খাড়্গে পরের পয়েন্টে যেতেই মমতা তাঁকে মৃদু স্বরে মনে করিয়ে দেন প্রথম শব্দটি, অর্থাৎ দেশের ‘অ্যাট্রোসিটি’ বা নৃশংসতা সংক্রান্ত বিষয়। খাড়্গে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের বক্তব্য সংশোধন করে ৩ নম্বর পয়েন্টের সাথে নৃশংসতার বিষয়টি জুড়ে দেন।
এরপর খাড়্গে যখন শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে ও ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের জোটে সহমতের কথা জানাচ্ছিলেন, তখন মমতা পাশে বসে দ্বিতীয় শব্দটি বলেন— ‘ভার্চুয়ালি’। অর্থাৎ, ওই দুই নেতা যে সশরীরে উপস্থিত না থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে সম্মতি জানিয়েছেন, সেই তথ্যটি তিনি খাড়্গেকে স্পষ্ট করে দেন। এই দুটি শব্দ ছাড়া বাকি পুরোটা সময় সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন তৃণমূল নেত্রী।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ক্ষোভ উগরে দিলেন মমতা
সাংবাদিকদের সামনে পুরোপুরি মুখ বন্ধ রাখলেও, জোটের অভ্যন্তরীণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অবশ্য নিজের ক্ষোভ ও আশঙ্কা আড়াল করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সূত্রের দাবি, বৈঠকে তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, বাংলায় চক্রান্ত করে জোর খাটানোর মাধ্যমে তৃণমূলকে পরাস্ত করা হয়েছে। জোটের বাকি শরিক দলগুলিকে সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আজ বাংলায় তৃণমূলের সঙ্গে যা করা হলো, আগামী দিনে অন্য রাজ্যেও একই খেলা খেলা হবে।” এর পাশাপাশি সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হওয়া হামলার প্রসঙ্গটিও তিনি জোটের অন্যান্য নেতাদের সামনে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, ২৫টি দল এই বৈঠকে হাজির থাকলেও এদিনের এই মেগা বৈঠকে আপ (AAP) এবং ডিএমকে (DMK)-র কোনও প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি।
জাতীয় রাজনীতিতেও কি কমছে গুরুত্ব?
তৃণমূল যখন বাংলার ক্ষমতায় আসীন ছিল, তখন দিল্লির দরবারে ইন্ডি জোটের রাশ বরাবর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতেন মমতা। আসন রফাতফা থেকে শুরু করে জোটের কর্মসূচির রূপরেখা— সবেতেই চালকের আসনে থাকতেন তিনি। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী কংগ্রেসের প্রকাশ্য সমালোচনা করতেও দ্বিধা করতেন না। কিন্তু বঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পর এবং দিল্লিতে নিজের চোখের সামনে সংসদীয় দল ভাঙার দিনে মমতার এমন নতিস্বীকার ও ‘বিধ্বস্ত’ রূপ দেখে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তীব্র হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বাংলার পর জাতীয় স্তরেও ইন্ডি জোটের রাশ ধীরে ধীরে হাতছাড়া হচ্ছে তৃণমূল সুপ্রিমোর? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখন এই উত্তরেরই সন্ধান করছেন।
দেশ, রাজ্য এবং রাজনীতির সমস্ত ব্রেকিং নিউজ এবং নির্ভুল খবর সবার আগে পড়তে চোখ রাখুন Starflix Bengali News-এর পাতায়।