কলকাতা: তারাতলায় নির্মীয়মাণ একটি গোডাউনের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় ক্রমশ বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে উদ্ধারকারী দল। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সেনাবাহিনী, দমকল ও স্থানীয় প্রশাসন। ভারী লোহার বিম, কংক্রিটের চাঙড় এবং নির্মাণসামগ্রীর নিচে চাপা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
উদ্ধারকাজে মিলল ২৯ জনকে
হাসপাতাল এবং দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ২০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহতদের মধ্যে ১৫ জনের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। চারজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং একজনকে ‘রেড জোনে’ রাখা হয়েছে, যার অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সাহায্য
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। পাশাপাশি গুরুতর আহতদের জন্য ১ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মৃত্যুর কোনও আর্থিক মূল্য হতে পারে না। তবুও সরকারের দায়িত্ব দুর্গত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি এবং তাঁদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
এখনও ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার আশঙ্কা
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির প্রাথমিক অনুমান, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কয়েকজন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। সেই কারণেই রাতদিন এক করে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। সেনাবাহিনী এবং NDRF-এর বিশেষজ্ঞ দল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য জীবিতদের খোঁজ চালাচ্ছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। নির্মাণকাজে কোনও নিরাপত্তা গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাক্তন সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক তরজাও তীব্র হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি আগের সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বলেন, “অবৈধ নির্মাণ এবং দুর্নীতির জেরেই আজ কলকাতাকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। গার্ডেনরিচের ঘটনার সময়ও যথাযথ উদ্ধারকাজ হয়নি। সেখানে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, অথচ একজনকেও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পূর্বতন প্রশাসনের সময় ভারী বিম কাটার মতো অত্যাবশ্যক উদ্ধার সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার সময় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ডেভেলপার ও কর্পোরেশন সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার আসগর হুসেনের নামও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও সূত্রের খবর, ধসে পড়া লোহার ছাদের নিচে চাপা পড়ে তিনিও প্রাণ হারিয়েছেন। পাশাপাশি কলকাতা পুরসভার অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তারাতলার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফের একবার শহরের নির্মাণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং অবৈধ নির্মাণের প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট সামনে এলে এই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি মিলবে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।