মুজফফরাবাদ: পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) গণবিক্ষোভের আগুন নেভাতে এবার চরম অমানবিকতার পথে হাঁটল ইসলামাবাদ। প্রতিবাদের স্বর চিরতরে মুছে ফেলতে গোটা অঞ্চলে কার্যত 'অঘোষিত অবরোধ' জারি করেছে পাকিস্তান সরকার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট অনুযায়ী, উপত্যকায় খাদ্য, জ্বালানি এবং জীবনদায়ী ওষুধের মতো অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী ঢোকার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির (JAAC) ডাকা লাগাতার ধর্মঘটে এমনিতেই স্তব্ধ জনজীবন, তার ওপর প্রশাসনের এই 'ভাতে মারার' নীতি গোটা অঞ্চলকে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংঘাতের সূত্রপাত কোথায়? কেন জ্বলছে উপত্যকা?
এই প্রবল গণ-অসন্তোষ এবং পুলিশি সংঘর্ষের নেপথ্যে রয়েছে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের আইনসভার ১২টি বিশেষ আসন। এই আসনগুলি মূলত ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। তবে স্থানীয় সংগঠনগুলির জোরালো অভিযোগ:
- পুতুল সরকার গঠন: এই সংরক্ষিত আসনগুলিকে হাতিয়ার করে ইসলামাবাদ বেআইনিভাবে নিজেদের অনুগত সরকার ওই অঞ্চলে চাপিয়ে দিচ্ছে।
- সন্ত্রাসবাদী তকমা: এই বেনিয়মের প্রতিবাদে 'জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি' পথে নামলে, পাকিস্তান সরকার তাদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দিয়ে ব্যাপক দমননীতি শুরু করে।
- প্রাণহানি: বিভিন্ন রিপোর্টের দাবি, পুলিশি হানাদারি ও লাগাতার সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত উপত্যকায় অন্তত ৫৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।
খাদ্য ও ওষুধের চরম আকাল, বিপন্ন জনজীবন
লাগাতার ধর্মঘট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় মুজফফরাবাদ, পুঞ্চ, রাওয়ালকোট থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত নীলম উপত্যকায় চরম শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বাজার-দোকান বা ওষুধের দোকান দিনের পর দিন বন্ধ। রেশন না পেয়ে অনাহারের মুখে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার পরিবার। জ্বালানির অভাবে পেট্রোল পাম্পগুলি খাঁ-খাঁ করছে। বাধ্য হয়ে অত্যন্ত চড়া দামে কালোবাজারের দ্বারস্থ হচ্ছেন স্থানীয়রা। মাসের পর মাস টাকা জমা দিয়েও মিলছে না আটা, চাল বা শিশুখাদ্যের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস।
সরকারি অবরোধের নিষ্ঠুর চিত্র: রাস্তায় ফেলা হচ্ছে ওষুধ!
বিবিসি উর্দু-র একটি প্রতিবেদনে পাক পুলিশের এক মারাত্মক এবং নিষ্ঠুর রূপ সামনে এসেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে সাধারণ মানুষ খাইবার পাখতুনখোয়া, রাওয়ালপিন্ডি বা ইসলামাবাদের মতো পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে নিজেদের খরচে খাবার ও ওষুধ কিনে আনছেন। কিন্তু ফেরার পথে পুলিশি চেকপোস্টে চরম হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে তাঁদের।
অভিযোগ, রাওয়ালপিন্ডি থেকে কিনে আনা আটা বা ওষুধ উপত্যকায় কিছুতেই ঢোকাতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশের নির্দেশে চেকপয়েন্টে নিজেদের হাতে কেনা খাবার ও ওষুধ রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা। অন্যদিকে, পচনশীল সামগ্রী ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বোঝাই অসংখ্য ট্রাক দিনের পর দিন সীমান্তে আটকে রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের সাফাই বনাম লক্ষ মানুষের মহামিছিল
পাকিস্তান সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অবরুদ্ধ করার এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, রাওয়ালকোটে চলা প্রায় ৭০ হাজার মানুষের বিশাল অবস্থান-বিক্ষোভ ভাঙতেই প্রশাসনের এই নিষ্ঠুর কৌশল। এর পালটা জবাব দিতে আগামী দিনে মুজফফরাবাদ অভিমুখে ১ লক্ষ মানুষের মহামিছিলের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের এই 'ভাতে মারার' নীতি পিওকে-র আগুন প্রশমিত করার বদলে বৃহত্তর গণবিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আগামী কয়েক দিন উপত্যকার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।