হাকিমপুর: নবান্নে ক্ষমতা বদলের পর থেকেই অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে ব্যাপকভাবে সক্রিয় নতুন প্রশাসন। গত মঙ্গলবার থেকে কলকাতার ৩ ঘণ্টা দূরত্বের হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে একের পর এক পরিবার এসে জড়ো হতে শুরু করেছে। কড়া পদক্ষেপের ভয়ে তারা মূলত বাংলাদেশেই ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছে। এই সমস্ত মানুষদের একটা বড় অংশকে ইতিমধ্যেই প্রশাসনের তরফ থেকে আটক করে সরকারি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে আইন অনুযায়ী তাঁদের নথি যাচাই করে বহিষ্কারের আইনি প্রক্রিয়া চালানো যায়। সীমান্ত চেকপোস্টের কাছে বেশ কিছু পরিবারকে আবার পরিত্যক্ত, নির্মীয়মাণ বাড়ির নিচেও আশ্রয় নিতে দেখা গিয়েছে।
ভোটব্যাঙ্কের জন্য আধার-ভোটার আইডি? বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি
সেখানে উপস্থিত বেশ কিছু কথিত অনুপ্রবেশকারী সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে যে বিস্ফোরক দাবি করেছেন, তা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে চরম শোরগোল ফেলে দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বিগত তৃণমূল জমানার স্থানীয় নেতারাই তাঁদের এই দেশে থাকার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের খুলনা থেকে আসা রুবি বিবি জানান, তাঁর কাছে এ দেশের আধার কার্ড, রেশন কার্ড থেকে শুরু করে সমস্ত নথিপত্রই ছিল। তাঁর অভিযোগ, "তৃণমূলের স্থানীয় নেতারাই এই কার্ডগুলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন কিচ্ছু হবে না। আমরা দমদমে থাকতাম, কাজ করতাম এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ সহ সব সরকারি সুবিধাও পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন সরকার বদলে গিয়েছে এবং বলা হচ্ছে বাংলাদেশিদের আর থাকতে দেওয়া হবে না। তাই আমাদের চলে যেতে হচ্ছে।"
যশোরের সন্তু মোল্লা জানান, তিনি ৯ বছর আগে ভারতে এসেছিলেন এবং ভোটও দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, "তৃণমূল নেতারা আমাদের ভোটার আইডি তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন দিদিই আবার ক্ষমতায় ফিরবেন। কিন্তু এবার আমাদের নাম তালিকা থেকে ডিলিট বা বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার বদলে গিয়েছে এবং পুলিশি ব্যবস্থা খুব কড়া। তাই আমরা ফিরে যাচ্ছি।"
একই সুর শোনা গেল ফরাদ শেকের গলাতেও। তিনি সাফ জানান, "তৃণমূল আমাদের ভোটার কার্ড বানাতে সাহায্য করেছিল। তারা আমাদের ভোটার কার্ড দিয়েছিল, আর আমরা তাদের ভোট দিয়েছিলাম।"
দালালচক্রের পর্দাফাঁস ও হোল্ডিং সেন্টারের কড়াকড়ি
সীমান্ত পারাপারের ক্ষেত্রে মোটা টাকার দালালচক্র বা মিডলম্যানদের সক্রিয়তার কথাও স্বীকার করেছেন অনেকে। যশোরের বাসিন্দা আক্তারুল মোল্লা জানান, চার বছর আগে ১০,০০০ টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়ে তিনি ভারতে ঢুকেছিলেন এবং দমদমে রঙের মিস্ত্রির কাজ করতেন। কিন্তু এখন পুলিশি কড়াকড়ির জেরে তিনি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সিরাজুল নামে আরেকজন জানান, পাঁচ বছর আগে ৬,০০০ টাকা দিয়ে তিনি সীমান্ত পার হয়েছিলেন।
স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বর্তমানে হাকিমপুর এলাকার হোল্ডিং সেন্টারগুলিতে ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে আইনি বহিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। স্বভাবতই, এই গ্রাউন্ড রিপোর্টের পর তৃণমূলকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে ব্যবহার করার যে অভিযোগ বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে তুলে আসছিল, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে সংঘাত আরও তীব্র হতে চলেছে।
