|
| এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনার এক বছর পরেও রহস্য অধরা। |
নয়াদিল্লি: আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ওড়া এয়ার ইন্ডিয়ার (Air India) ফ্লাইট AI171 উড্ডয়নের মাত্র ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল। ভারতের বিমান চলাচলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার এক বছর পার হয়ে গিয়েছে। তবুও নিহত ২৬০ জনের পরিবার, তদন্তকারী আধিকারিক এবং বিমান বিশেষজ্ঞদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে একটাই প্রশ্ন— ঠিক কী কারণে সেদিন আকাশ থেকে খসে পড়েছিল অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার (Boeing 787 Dreamliner)?
২০২৫ সালের ১২ জুন ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ২৪১ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যের পাশাপাশি মাটিতে থাকা ১৯ জন প্রাণ হারান। ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)-এর প্রাথমিক তদন্তে ককপিটের শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি জানা গেলেও, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও তীব্র ধোঁয়াশা ও বিতর্ক অব্যাহত।
ককপিটে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল?
AAIB-এর প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানের ককপিটে থাকা দুটি ‘ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ’ রহস্যজনকভাবে “RUN” থেকে “CUTOFF” অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে দুই ইঞ্জিনেই জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে বিমানটি শক্তি হারিয়ে আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের কাছে আছড়ে পড়ে। পাইলটরা সুইচ দুটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করলেও, বিমানটিকে বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত উচ্চতা বা সময় তাঁদের হাতে ছিল না। প্রাথমিক রিপোর্টে বোয়িং ৭৮৭ বা জিই (GE) ইঞ্জিনের তাৎক্ষণিক কোনও যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ মেলেনি।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে উঠে আসছে তিন তত্ত্ব
চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন:
- তত্ত্ব ১: ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ: ককপিট ভয়েস রেকর্ডারে এক পাইলটকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, "তুমি কেন ফুয়েল বন্ধ করলে?" যার জবাবে অন্যজন বলেন, "আমি তা করিনি।" অত্যন্ত অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন সুমিত সবরওয়াল (১৫,৬০০ ঘণ্টার উড়ান অভিজ্ঞতা) এবং ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর (৩,৪০০ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা) সেদিন বিমানটি চালাচ্ছিলেন। ফুয়েল সুইচে বিশেষ লকিং ব্যবস্থা থাকায় এটি আপনাআপনি বন্ধ হওয়া কঠিন। তবে AAIB জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পাইলটদের সরাসরি দোষারোপ করা উচিত নয়।
- তত্ত্ব ২: অনিচ্ছাকৃত মানবিক ভুল: ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান পাইলটস (FIP) জানিয়েছে, সমস্ত যান্ত্রিক দিক খতিয়ে না দেখে পাইলটদের দায়ী করা অন্যায়। FIP-এর সভাপতি ক্যাপ্টেন সিএস রনধাওয়ার দাবি, বিমানটিতে আগে থেকেই বৈদ্যুতিক গোলযোগ এবং স্ট্যাবিলাইজারের সমস্যা ছিল। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম মাত্র দুই সেকেন্ডের অডিও ক্লিপকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
- তত্ত্ব ৩: প্রযুক্তিগত বা সফটওয়্যার ত্রুটি: স্বাধীন গবেষকদের একাংশের মতে, কোনও গোপন সফটওয়্যার ত্রুটি বা ইলেকট্রনিক গোলযোগের কারণে ককপিটে ভুল সংকেত যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও মার্কিন বা ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই দুর্ঘটনার পর ড্রিমলাইনার উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করেনি।
এখনও উত্তরের অপেক্ষায় স্বজনহারা পরিবার
এই দুর্ঘটনার তদন্তে ভারতের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত রয়েছেন। একমাত্র জীবিত উদ্ধার হওয়া বিশ্বাসকুমার রমেশ এবং নিহতদের পরিবার কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, বরং ককপিটে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল তার স্বচ্ছ উত্তর চাইছেন। তাঁদের দাবি, ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে দুই ইঞ্জিনের জ্বালানিহীন হয়ে পড়ার আসল কারণ দ্রুত প্রকাশ্যে আনা হোক।