বিশ্ব উষ্ণায়নের ধাক্কায় বাড়ছে বিপর্যয়, সমাধান জানা থাকলেও রূপায়ণে বাধা কোথায়?
বিশেষ প্রতিবেদন: বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, প্রতিদিনের বাস্তব। ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। মানুষের জীবন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অভিবাসনের উপর তার প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে একাধিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় জলবায়ু সঙ্কটের ভয়াবহতা আরও সামনে এনেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ সুদান—বিভিন্ন জায়গায় চরম আবহাওয়ার ঘটনা প্রাণহানি ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের শক্তি বাড়ছে। অতিরিক্ত উষ্ণতা সমুদ্রের উপর প্রভাব ফেলছে, যার ফলে ঝড় আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দাবানল, খরা এবং তাপপ্রবাহের ঘটনাও বাড়ছে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন মূলত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন-সহ গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর তাপ বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা পায়। এর ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রভাব পড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায়। মেরু অঞ্চলের বরফ ও পারমাফ্রস্ট দ্রুত গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় শহরগুলি বড় বিপদের মুখে পড়তে পারে। মুম্বই, কলকাতা ও চেন্নাইয়ের মতো শহরেও জলবায়ু-জনিত ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠ নয়, মহাসাগরের অম্লতা বৃদ্ধিও বড় উদ্বেগের কারণ। সমুদ্র অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করায় জল আরও অম্লীয় হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রবাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের উপর গুরুতর প্রভাব পড়ছে।চরম আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তায়ও। বন্যা, খরা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে খাদ্য সঙ্কট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যারও কারণ হয়ে উঠছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলাভাব, খাদ্য সঙ্কট এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বহু মানুষ নিজের এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। আগামী দিনে জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন রুখতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি-সহ আন্তর্জাতিক স্তরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা রয়ে গিয়েছে বাস্তবায়নে। উন্নত দেশগুলি অনেক সময় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির যুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পালন করতে পারে না। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে সবুজ প্রযুক্তি ও অর্থায়ন সহজলভ্য নয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। অনেক দেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিশ্রুতি দিলেও দেশে ফিরে তা কার্যকর করে না। কারণ জলবায়ু নীতি অনেক সময় জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নগরায়ন ও শিল্পায়নের চাপও বড় সমস্যা। বাসস্থান ও শিল্পের জন্য জমির চাহিদা বাড়ায় অনেক জায়গায় জলাভূমি ভরাট, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। কলকাতা বা ঢাকার মতো শহরে জলাভূমি নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে—পরিবেশ রক্ষা শুধু নৈতিক দায় নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। পরিবেশ ধ্বংসের আর্থিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি। তাই জলবায়ু নীতিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।বিশ্ব উষ্ণায়নের সমস্যা জানা। সমাধানের পথও খুব অজানা নয়। কিন্তু বাধা রয়েছে রূপায়ণে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সঙ্কট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন একটাই—বিপর্যয়কে প্রতিদিনের বাস্তব হিসেবে মেনে নেওয়া হবে, নাকি সময় থাকতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে?