রাস্তাঘাটে পথ কুকুরের উপদ্রব এবং কামড়ের আতঙ্ক থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে এবার কড়া অবস্থান নিল দেশের শীর্ষ আদালত (Supreme Court)। জননিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পথ কুকুর স্থানান্তর ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি যুগান্তকারী রায় দিল সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ।
কী জানাল শীর্ষ আদালত? সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো সংবেদনশীল এলাকা যেমন— স্কুল, কলেজ বা হাসপাতাল চত্বর থেকে যদি পথ কুকুরদের বন্ধ্যাকরণ বা টিকাকরণের জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে কাজ শেষে তাদের আর কোনোভাবেই সেই পুরনো জায়গায় ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে শীর্ষ আদালত তার পুরনো ২৫ নভেম্বরের নির্দেশিকাই বহাল রেখেছে এবং এই নিয়মের বিরোধিতা করে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর করা সমস্ত আর্জি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পথ কুকুরের কামড়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ— সাধারণ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেই আদালত এই কড়া নির্দেশ দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নয়া নির্দেশিকা: একনজরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পথ কুকুর নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন প্রকাশ করেছে আদালত:
নির্দিষ্ট এলাকা থেকে অপসারণ: স্কুল, কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং হাইওয়ের মতো জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকাগুলো থেকে পথ কুকুরদের অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।
নিরাপত্তা বেষ্টনী ও শেল্টার: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে বাইরের কুকুর যাতে ঢুকতে না পারে, তার জন্য পাঁচিল বা উপযুক্ত বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কুকুরদের নির্দিষ্ট শেল্টার হোম বা পশু আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ ও অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিন: পথ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রতিটি জেলায় বাধ্যতামূলকভাবে পশু জন্মনিয়ন্ত্রণ বা অ্যানিম্যাল বার্থ কন্ট্রোল (ABC) কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-রেবিস (Anti-Rabies) ভ্যাকসিনের জোগান সুনিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।
যন্ত্রণাহীন মৃত্যু (Euthanasia): যেসব কুকুর চরমভাবে রোগাক্রান্ত, হিংস্র বা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, নির্দিষ্ট আইনি নিয়ম মেনে তাদের 'ইউথানাসিয়া' বা যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
আধিকারিকদের আইনি রক্ষাকবচ ও ডেডলাইন এই নির্দেশিকা যাতে দ্রুত এবং বাধাহীনভাবে কার্যকর করা যায়, তার জন্য প্রশাসন বা পুরসভার কর্মীদের বিশেষ আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে। পথ কুকুর সরাতে গিয়ে পুর আধিকারিক বা সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো পশুপ্রেমী সংগঠন এফআইআর (FIR) দায়ের করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়েছে আদালত।
আগামী ৮ সপ্তাহের মধ্যে এই নির্দেশিকা কতটা কার্যকর হলো, তা জানিয়ে প্রতিটি রাজ্য সরকারকে স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজরদারি চালাবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের এই সময়োপযোগী রায়ের ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া ও বয়স্করা পথ কুকুরের আতঙ্ক থেকে অনেকটাই স্বস্তি পাবেন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।